পাসপোর্ট হলো আমাদের আন্তর্জাতিক পরিচয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ দলিল। যদি আপনার পাসপোর্টের মেয়াদ শেষ হয়ে যায় বা কাছাকাছি চলে আসে, তাহলে বাংলাদেশে পাসপোর্ট রিনিউ করা জরুরি। আমি নিজে একজন ভ্রমণপ্রেমী এবং ব্লগার হিসেবে বেশ কয়েকবার পাসপোর্ট রিনিউ করেছি, এবং প্রতিবারই শিখেছি কিছু নতুন টিপস।
২০২৬ সালে বাংলাদেশে পাসপোর্টের মেয়াদ বাড়ানোর নিয়মগুলো আরও সহজ এবং ডিজিটাল হয়েছে, বিশেষ করে ই-পাসপোর্টের মাধ্যমে। এই পোস্টে আমি আপনাদের সাথে শেয়ার করব পাসপোর্ট রিনিউয়ালের সম্পূর্ণ প্রক্রিয়া, প্রয়োজনীয় ডকুমেন্টস, ফি, সময়সীমা এবং কিছু বাস্তবসম্মত পরামর্শ। যদি আপনি প্রথমবার রিনিউ করছেন বা বিদেশ থেকে করছেন, তাহলে এই গাইড আপনার জন্য আদর্শ। চলুন শুরু করি!
বাংলাদেশে পাসপোর্ট রিনিউ ২০২৬ কী এবং কেন জরুরি?
পাসপোর্ট রিনিউ মানে হলো আপনার বিদ্যমান পাসপোর্টের মেয়াদ বাড়ানো বা নতুন করে ইস্যু করা। বাংলাদেশে এখন মূলত ই-পাসপোর্ট (e-Passport) চালু আছে, যা চিপ-ভিত্তিক এবং আরও নিরাপদ। যদি আপনার পুরনো পাসপোর্ট মেশিন রিডেবল পাসপোর্ট (MRP) হয়, তাহলে রিনিউ করলে আপনি ই-পাসপোর্ট পাবেন।
কেন রিনিউ দরকার? কারণ মেয়াদ উত্তীর্ণ পাসপোর্ট দিয়ে আপনি বিদেশ ভ্রমণ করতে পারবেন না, ভিসা আবেদন করতে পারবেন না, এবং এমনকি কিছু দেশে প্রবেশের সময় সমস্যা হতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, অনেক দেশ চায় যে আপনার পাসপোর্টের মেয়াদ অন্তত ৬ মাস থাকবে। তাই, মেয়াদ শেষ হওয়ার ৬-১২ মাস আগে রিনিউ করা ভালো।
আমার অভিজ্ঞতা থেকে বলছি, ২০২৩ সালে আমি আমার পাসপোর্ট রিনিউ করেছি, এবং তখন থেকে প্রক্রিয়াটা অনেক দ্রুত হয়েছে। ২০২৬ সালে ডিপার্টমেন্ট অফ ইমিগ্রেশন অ্যান্ড পাসপোর্ট (DIP) এর অফিসিয়াল ওয়েবসাইটে সবকিছু অনলাইনে সম্পন্ন করা যায়, যা সময় বাঁচায়।
পাসপোর্টের ধরন এবং মেয়াদের বিস্তারিত
বাংলাদেশী পাসপোর্ট মূলত তিন ধরনের: সাধারণ (Ordinary), অফিসিয়াল এবং ডিপ্লোম্যাটিক। সাধারণ নাগরিকদের জন্য সাধারণ পাসপোর্টই প্রযোজ্য। মেয়াদ সাধারণত ৫ বা ১০ বছরের হয়। ২০২৬ সালে, ১৮ বছরের নিচের শিশুদের জন্য শুধু ৫ বছরের মেয়াদ দেওয়া হয়।
- ৫ বছরের মেয়াদ: সাধারণ ভ্রমণকারীদের জন্য উপযুক্ত।
- ১০ বছরের মেয়াদ: দীর্ঘমেয়াদী ভ্রমণকারী বা প্রবাসীদের জন্য ভালো, কিন্তু ফি বেশি।
সতর্কতা: যদি আপনার পাসপোর্টের মেয়াদ ১ বছরের বেশি থাকে, তাহলে রিনিউ করার জন্য বিশেষ কারণ দেখাতে হবে, যেমন পাসপোর্ট হারিয়ে যাওয়া বা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া।
বাংলাদেশে পাসপোর্ট রিনিউ ২০২৬ কোথায় এবং কখন করবেন?
পাসপোর্ট রিনিউ করার আদর্শ সময় হলো মেয়াদ শেষ হওয়ার ৬ মাস আগে। যদি মেয়াদ উত্তীর্ণ হয়ে যায়, তাহলে কোনো সমস্যা নেই—আপনি এখনও রিনিউ করতে পারবেন, কিন্তু দেরি করলে ভ্রমণ পরিকল্পনায় সমস্যা হতে পারে।
২০২৬ সালে, বাংলাদেশের ভিতরে রিনিউ করতে হলে আপনাকে রিজিওনাল পাসপোর্ট অফিস (RPO) বা ডিভিশনাল পাসপোর্ট অফিসে যেতে হবে। ঢাকায় অবস্থিত প্রধান অফিস আগারগাঁওয়ে।
বিদেশে থাকলে, নিকটস্থ বাংলাদেশী দূতাবাস বা কনস্যুলেটে আবেদন করুন। উদাহরণস্বরূপ, USA-তে থাকলে ওয়াশিংটন বা লস অ্যাঞ্জেলেসের কনস্যুলেটে।
বিদেশ থেকে রিনিউয়ালের বিশেষ নিয়ম
প্রবাসীদের জন্য ২০২৬ সাল পর্যন্ত MRP রিনিউ করা যাবে, কিন্তু ই-পাসপোর্টকে উৎসাহিত করা হচ্ছে। আবেদন মেল দিয়ে পাঠানো যায়, কিন্তু বায়োমেট্রিকের জন্য অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিতে হবে।
সতর্কতামূলক নোট: বিদেশ থেকে রিনিউ করলে ডেলিভারি সময় বেশি লাগতে পারে, তাই আগাম পরিকল্পনা করুন।
প্রয়োজনীয় ডকুমেন্টসের তালিকা
পাসপোর্ট রিনিউয়ালের জন্য ডকুমেন্টস সঠিকভাবে প্রস্তুত করা খুব জরুরি। ভুল হলে আবেদন রিজেক্ট হতে পারে। নিচে একটি টেবিলে বিস্তারিত তালিকা দেওয়া হলো:

পরামর্শ: সব ডকুমেন্টসের ফটোকপি নিন এবং অরিজিনাল সাথে রাখুন। যদি আপনার নাম বা ঠিকানা পরিবর্তন হয়, তাহলে সাপোর্টিং ডকুমেন্ট যোগ করুন, যেমন ম্যারেজ সার্টিফিকেট। আমার অভিজ্ঞতায়, NID না থাকলে জন্ম সার্টিফিকেট দিয়ে সমস্যা হয়নি, কিন্তু NID থাকলে প্রক্রিয়া দ্রুত হয়।
শিশু বা নাবালকদের জন্য বিশেষ ডকুমেন্টস
- অভিভাবকের পাসপোর্ট বা NID কপি।
- জন্ম সার্টিফিকেট অবশ্যই।
- যদি একা অভিভাবক, তাহলে কোর্ট অর্ডার লাগতে পারে।
সতর্কতা: ডকুমেন্টস জাল করবেন না, কারণ বায়োমেট্রিক চেকে ধরা পড়লে আইনি সমস্যা হতে পারে।
বাংলাদেশে পাসপোর্ট রিনিউ ২০২৬ — ধাপে ধাপে প্রক্রিয়া
এখন চলুন মূল অংশে: কীভাবে ধাপে ধাপে রিনিউ করবেন। ২০২৬ সালে প্রক্রিয়াটা মূলত অনলাইন-ভিত্তিক।
ধাপ ১: অনলাইন রেজিস্ট্রেশন
- www.epassport.gov.bd সাইটে যান।
- “Apply Online” ক্লিক করুন এবং “Re-Issue” অপশন সিলেক্ট করুন।
- ফর্ম ফিল করুন: ব্যক্তিগত তথ্য, ঠিকানা, পুরনো পাসপোর্ট নম্বর ইত্যাদি।
- ছবি এবং সিগনেচার আপলোড করুন।

পরামর্শ: ফর্ম ফিল করার সময় সব তথ্য সঠিক দিন। ভুল হলে পরে সংশোধন করতে অতিরিক্ত ফি লাগতে পারে।
ধাপ ২: ফি পেমেন্ট
ফি অনলাইনে ekpay দিয়ে বা ব্যাংকে চালান দিয়ে পে করুন। ফি স্ট্রাকচার নিচে:
- ৫ বছর, ৪৮ পেজ: রেগুলার ৪,০২৫ টাকা, এক্সপ্রেস ৬,০২৫ টাকা, সুপার এক্সপ্রেস ৮,০২৫ টাকা।
- ১০ বছর, ৪৮ পেজ: রেগুলার ৫,৭৫০ টাকা, এক্সপ্রেস ৭,৭৫০ টাকা, সুপার এক্সপ্রেস ১০,৩৫০ টাকা।
- ৬৪ পেজের জন্য অতিরিক্ত ১,১৫০ টাকা।
সতর্কতা: ফি পে করার পর রিসিপ্ট প্রিন্ট করুন এবং সাথে রাখুন।
ধাপ ৩: অ্যাপয়েন্টমেন্ট এবং বায়োমেট্রিক
- অনলাইনে অ্যাপয়েন্টমেন্ট বুক করুন বা সাইটে দেওয়া তারিখে RPO-তে যান।
- বায়োমেট্রিক: ফিঙ্গারপ্রিন্ট, আইরিস স্ক্যান এবং ছবি তোলা হবে।
- এনরোলমেন্ট স্লিপ পাবেন।

আমার অভিজ্ঞতা: ঢাকার অফিসে সকালে গেলে কম ভিড় থাকে। মাস্ক এবং স্যানিটাইজার নিয়ে যান।
ধাপ ৪: স্ট্যাটাস ট্র্যাকিং
- সাইটে লগইন করে বা SMS দিয়ে ট্র্যাক করুন।
- সময়: রেগুলার ১৫-২১ দিন, এক্সপ্রেস ৭ দিন, সুপার ২ দিন।
ধাপ ৫: পাসপোর্ট সংগ্রহ
- এনরোলমেন্ট স্লিপ দিয়ে অফিস থেকে নিন বা ডেলিভারি অপশন চয়ন করুন (অতিরিক্ত ফি)।
পরামর্শ: পাসপোর্ট পাওয়ার পর চেক করুন সব তথ্য সঠিক কি না।
আরও পড়ুন: বাংলাদেশে ই পাসপোর্ট রিনিউ করার নিয়ম ২০২৬
সাধারণ ভুল এবং সতর্কতামূলক টিপস
- ভুল ১: অনলাইন ফর্মে ভুল তথ্য দেওয়া। সমাধান: ডাবল চেক করুন।
- ভুল ২: ডকুমেন্টস ভুলে যাওয়া। সমাধান: চেকলিস্ট তৈরি করুন।
- টিপ: করোনার পর থেকে অ্যাপয়েন্টমেন্ট সিস্টেম চালু, তাই আগে বুক করুন।
- প্রবাসীদের জন্য: মেল দিয়ে আবেদন পাঠান, কিন্তু ট্র্যাকিং নম্বর রাখুন।
সাধারণ প্রশ্নোত্তর
- প্রশ্ন: মেয়াদ উত্তীর্ণ পাসপোর্ট রিনিউ করতে কত সময় লাগে? উত্তর: একই প্রক্রিয়া, কোনো অতিরিক্ত ফাইন নেই।
- প্রশ্ন: বিদেশ থেকে কীভাবে রিনিউ করব? উত্তর: দূতাবাসে আবেদন করুন, ফি USD-তে।
- প্রশ্ন: ই-পাসপোর্ট কীভাবে MRP থেকে আলাদা? উত্তর: ই-পাসপোর্টে চিপ আছে, আরও নিরাপদ।
উপসংহার
পাসপোর্টের মেয়াদ বাড়ানো একটি সহজ প্রক্রিয়া, যদি আপনি ধাপগুলো সঠিকভাবে অনুসরণ করেন। ২০২৬ সালে ডিজিটালাইজেশনের কারণে এটি আরও সুবিধাজনক হয়েছে। আমার অভিজ্ঞতা থেকে বলছি, আগাম পরিকল্পনা করলে কোনো ঝামেলা হয় না। যদি আপনার কোনো প্রশ্ন থাকে, কমেন্টে জানান। সবসময় অফিসিয়াল সাইট চেক করুন এবং ভুল তথ্য এড়ান। নিরাপদ ভ্রমণ করুন!